সি এস খতিয়ান যাচাই করতে চাচ্ছেন কিন্তু নিয়ম জানেন না? ঘরে বসে অনলাইনে যেকোনো জমির সি এস খতিয়ান অনুসন্ধান করার পদ্ধতি জানতে পারবেন এখানে।
পুরনো জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব হলে সবার আগে যে দলিলটির কথা মনে আসে, তা হলো সিএস খতিয়ান। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জরিপ রেকর্ড হিসেবে আদালত ও ভূমি অফিসে এই খতিয়ানকেই মূল ভিত্তি ধরা হয়। জমির সিএস খতিয়ান বের করতে চাইলে এখন আর ভূমি অফিসে দৌড়াদৌড়ির দরকার নেই, ঘরে বসে মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়েই এই খতিয়ান যাচাই করা যায়।
এই পোস্টে সিএস খতিয়ান কী, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, অনলাইনে কীভাবে যাচাই করবেন এবং খতিয়ানের অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহের জন্য কীভাবে আবেদন করবেন তার সম্পূর্ণ পদ্ধতি দেখানো হয়েছে। চলুন, আরও বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
আলোচিত বিষয়বস্তু
সিএস খতিয়ান কাকে বলে
সিএস খতিয়ান বা Cadastral Survey হলো উপমহাদেশে পরিচালিত সবচেয়ে প্রথম ভূমি জরিপ। ১৮৮৮ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের তত্ত্বাবধানে এই জরিপ পরিচালিত হয়, যা কক্সবাজারের রামু থানা থেকে শুরু হয়ে দিনাজপুরে গিয়ে শেষ হয়েছিল। সেই সময় সরকারি আমিনরা সরেজমিনে প্রতিটি জমি মেপে মালিক বা দখলদারের নাম, দাগ নম্বর এবং জমির শ্রেণি লিপিবদ্ধ করে যে রেকর্ড তৈরি করেন, সেটিই সিএস খতিয়ান নামে পরিচিত।
যেহেতু এটি সরেজমিনে জরিপ করে তৈরি প্রথম রেকর্ড, তাই মামলা-মোকদ্দমা কিংবা মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই খতিয়ানকেই মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীতে এসএ, আরএস কিংবা বিএস জরিপ যা-ই হোক না কেন, জমির আসল ইতিহাস জানতে হলে সেই যাত্রা শুরু হয় এই সিএস খতিয়ান থেকেই। তবে সিলেট অঞ্চলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে সিএস জরিপের পরিবর্তে ১৯৬৩ সালে শেষ হওয়া এসএ জরিপ পরিচালিত হয়েছিল।
সিএস খতিয়ান যাচাই করতে কী কী তথ্য লাগবে
অনলাইনে সিএস খতিয়ান চেক করতে বেশ কিছু তথ্য প্রয়োজন হবে। এগুলো হলো –
- জমির বিভাগের নাম
- জেলার নাম
- উপজেলা/থানার নাম
- মৌজার নাম বা জেএল নম্বর
- খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর অথবা মালিকের নাম (এর যেকোনো একটি হলেই চলবে)
খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে চিন্তার কিছু নেই। শুধু দাগ নম্বর বা জমির মালিকের নাম দিয়েও অনলাইনে খতিয়ান অনুসন্ধান করা সম্ভব।
সিএস খতিয়ান অনলাইনে যাচাই করার নিয়ম
বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড রেকর্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে সিএস খতিয়ান যাচাই করতে হয়। আগে এই সেবা eporcha.gov.bd ওয়েবসাইটে ছিল, তবে বর্তমানে এটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে dlrms.land.gov.bd-তে। তাই মালিকানা যাচাই করতে হলে এই নতুন ঠিকানাতেই যেতে হবে।
সি এস খতিয়ান অনুসন্ধান করার পদ্ধতি
নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে যেকোনো জমির সি এস খতিয়ানের তথ্য অনলাইনে অনুসন্ধান করতে পারবেন।
ধাপ ১: ওয়েবসাইট ভিজিট
খতিয়ান অনুসন্ধান করতে ভিজিট করুন এই লিংকে https://dlrms.land.gov.bd । ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর সার্ভে খতিয়ান অপশনটি নির্বাচন করুন। যদিও ডিফল্টভাবে এটিই সিলেক্ট করা থাকে।
ধাপ ২: তথ্য নির্বাচন
সার্ভে খতিয়ান অপশনে আপনার জমির ঠিকানা অনুযায়ী বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা/থানা একে একে সিলেক্ট করুন। অতঃপর, খতিয়ানের ধরণ ঘরের ভিতর সি এস খতিয়ান সিলেক্ট করুন। মৌজা ঘরে মৌজার নাম খুঁজুন বা জেএল নং লিখে মৌজা বের করে সিলেক্ট করুন।
অতঃপর, খতিয়ানের তালিকা ঘরে সার্চ বক্সে খতিয়ান নং লিখুন এবং খুঁজুন বাটনে ক্লিক করুন অথবা খতিয়ানের তালিকা থেকে খতিয়ান খুঁজে সিলেক্ট করুন। খতিয়ান নং মনে না থাকলে অধিকতর অনুসন্ধান বাটনে ক্লিক করুন এবং জমির দাগ নং বা জমির মালিকের নাম লিখেও খতিয়ান খুঁজে বের করতে পারবেন।

ধাপ ৩: খতিয়ান যাচাই
খতিয়ান খুঁজে পেলে পরপর দুইবার ক্লিক করতে হবে খতিয়ানের উপর। খতিয়ানের উপর ডাবল ক্লিক করলেই উক্ত জমির খতিয়ানের বিস্তারিত তথ্য দেখতে পারবেন।
এখানে জমির মোট পরিমাণ, জমির মালিকদের নাম, জমির ঠিকানা, দাগ ও খতিয়ান নং সহ সকল তথ্য দেখতে পারবেন।
একটা বিষয় মাথায় রাখা জরুরি, নতুন ওয়েবসাইট থেকে নামজারি খতিয়ান অনুসন্ধান, আরএস, বিআরএস, বিএস, এসএ এবং সিএস – এই সব ধরনের খতিয়ানের তথ্যই যাচাই করা যায়। তবে সব মৌজার সব পুরনো খতিয়ান এখনও সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাইজ হয়নি।
বিশেষ করে সিএস বা এসএ খতিয়ানের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। আপনার জমির সি এস খতিয়ান বা অন্য খতিয়ান খুঁজে না পেলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করাই একমাত্র উপায়।
সিএস খতিয়ানের কপির জন্য অনলাইন আবেদন
খতিয়ান খুঁজে পাওয়ার পর সেটির অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে চাইলে খতিয়ান আবেদন করতে হবে। আবেদন করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।
ধাপ ১ – ঝুড়িতে যুক্ত করুন
খতিয়ান যাচাই করার পর খতিয়ানের যে তথ্যগুলো থাকবে, সেখানেই ‘ঝুড়িতে রাখুন’ বাটন পাবেন, এটিতে ক্লিক করুন। এরপর ওপরের ডান পাশে থাকা ঝুড়ি আইকনে ক্লিক করুন।

ধাপ ২ – জেলা অফিস নির্বাচন
অতঃপর, খতিয়ানটি সিলেক্ট করুন এবং অনলাইন কপি নাকি সার্টিফাইড কপি নেবেন তা সিলেক্ট করুন। খতিয়ানের কপি সংগ্রহের জন্য আপনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সিলেক্ট করে নিচের দিকে চেকআউট করুন বাটনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৩ – লগইন বা রেজিস্ট্রেশন
চেকআউট করলে land.gov.bd ওয়েবসাইটে নিয়ে যাবে। এখানে মোবাইল নম্বর দিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলুন অথবা আগের অ্যাকাউন্ট থাকলে লগইন করুন।
ধাপ ৪ – প্রোফাইল সম্পন্ন করুন
লগইনের পর ভোটার আইডি কার্ডের তথ্য দিয়ে প্রোফাইল ১০০% পূরণ করতে হবে। প্রোফাইল অসম্পূর্ণ থাকলে খতিয়ান আবেদন করা যাবে না।
ধাপ ৫ – ফি পরিশোধ ও আবেদন জমা
মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়) বা ব্যাংক কার্ড দিয়ে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করলে আবেদন সম্পন্ন হবে। এরপর আবেদনের একটি কপি ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিয়ে নিন।
আবেদনের কপিতে উল্লেখিত নির্ধারিত তারিখে সেটি সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জমা দিলেই সিএস খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
কেন সিএস খতিয়ান যাচাই করবেন
জমি কেনার আগে বিক্রেতা প্রকৃত মালিক কিনা তা নিশ্চিত হতে, ব্যাংকে জমি বন্ধক রেখে ঋণ নিতে সিএস খতিয়ান অপরিহার্য। যেহেতু এটি সবচেয়ে পুরনো রেকর্ড, তাই জমির মূল মালিক কে ছিলেন এবং কীভাবে হাতবদল হয়ে বর্তমান মালিকের কাছে এসেছে তার পুরো ইতিহাস এখানেই পাওয়া যায়।
শেষ কথা
অনলাইনে সি এস খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম এবং কীভাবে সি এস খতিয়ান অনলাইন আবেদন করতে হয় সেটিও দেখানো হয়েছে এখানে। খতিয়ান অনুসন্ধান এবং আবেদন করার জন্য এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা কম্পিউটারের দোকানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঘরে বসে সহজেই এই কাজগুলো করতে পারবেন।
সাধারণত জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর
সিএস খতিয়ান অনলাইনে যাচাই করতে কত টাকা লাগে?
শুধু খতিয়ানের তথ্য অনলাইনে দেখতে বা অনুসন্ধান করতে কোনো টাকা লাগে না। তবে অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে চাইলে সরকার নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হয়।
সব এলাকার সিএস খতিয়ান কি অনলাইনে পাওয়া যায়?
না, এখনও সব মৌজার সব সিএস খতিয়ান সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাইজ হয়নি। অনলাইনে খুঁজে না পেলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করতে হবে।
সিএস খতিয়ান আর এসএ খতিয়ানের মধ্যে পার্থক্য কী?
সিএস খতিয়ান তৈরি হয় সরেজমিনে জমি পরিমাপ করে, যেখানে জমির প্রকৃত মালিক বা দখলকারের তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে ১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ আইন পাসের পর জরিপ কর্মচারীরা সরেজমিনে না গিয়ে সিএস খতিয়ানের ভিত্তিতেই যে খতিয়ান তৈরি করেন, সেটি এসএ খতিয়ান নামে পরিচিত।
খতিয়ান নম্বর না জানা থাকলে কীভাবে সিএস খতিয়ান খুঁজবো?
খতিয়ান নম্বর না থাকলে অধিকতর অনুসন্ধান অপশনে গিয়ে জমির দাগ নম্বর অথবা মালিকের নাম দিয়ে সহজেই খতিয়ান খুঁজে বের করা যায়।





